মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১০:৫৩ অপরাহ্ন

পথচারী, পদচারী ও একটি সড়কের আত্মকথন

পথচারী, পদচারী ও একটি সড়কের আত্মকথন

শুরুতেই বলে রাখি, আমি এই শহরেরই একজন বাসিন্দা। রাজধানীর মহাসড়কে নিত্যদিন আমাকে চলতে হয়। পাবলিক বাসে চড়ি। আবার কখনও সখনও গাড়িও চালাতে হয়। তাই একাধারে আমি চালক ও যাত্রী। প্রতিনিয়ত এই প্রতিশ্রুতি আর গুজবের শহরে কতো কী ঘটে চলেছে তার কিছুটা হলেও আমার জানা। একজন নাগরিক হিসেবে কিছু কথা শেয়ার করতে চাই, তবে কেউ ভাববেন না যে আমি ঘাতক বাসচালকের পক্ষে কথা বলছি। বরাবরই আমি বেপরোয়া গাড়ি চালনার বিপক্ষে, মুনাফাখোর বাসমালিকদের পক্ষেও আমি যুক্তির ঝাণ্ড তুলছি না।

ঘটনা-১
সাত সকালে অফিস যাচ্ছি। ‘কোমলমতি’ ছেলেরা যাচ্ছে স্কুলে। স্কুলে না গেলে ওরা শিখবে কী করে! আমার সামনে একটা টেম্পো যাচ্ছে। হেলেদুলে চলছে যেন তার খুব একটা তাড়া নেই। আদতে তাড়া আছে কিন্তু ইঞ্জিন সে কথা শুনছে না। ইঞ্জিন বুড়িয়ে গেছে, বা ভেতরে গণ্ডগোল। টেম্পোর ভিতরে বসে আছে বারোজন, সামনে দুজন আর পেছনে পাদানিতে হেল্পারের সাথে গলাগলি করে ঝুলছে আরো তিনজন। তাদের দুজন স্কুলছাত্র, আর একজন ঢাউস সাইজের ভদ্রলোক। তাকে ভদ্রলোকই বলবো। কারণ বেশভূষায় তাকে তাই মনে হয়। টেম্পো সামনে এগোতে  পারে না, কারণ তার ইঞ্জিনের জোর নেই। টেম্পো টলছে। আমার উদ্বেগ আপাতত টেম্পো নিয়ে নয়, আমি ভাবছে পেছনে পাদানিতে করোলার মতো ঝুলতে থাকা তিনজনকে নিয়ে। একটু এগিয়ে স্পিডব্রেকার। আমি স্পষ্ট দেখলাম, টেম্পো স্পিডব্রেকার টপকাতে গিয়ে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেল। সেই সাথে বিপদজনকভাবে দুলে উঠলো পেছনের পাদানি।

কড়মড় করে ধসে পড়লো মরচে ধরা পাদানি। সাথে সাথে তিনজন যাত্রী রাস্তায় গড়িয়ে পড়লো। এদের দুজন কিন্তু ছাত্র, যারা কিনা নিরাপদ সড়ক চেয়ে সপ্তাখানেক অনেক চিৎকার চেঁচামেচি করেছে। ভাগ্যিস পেছনের বাসটা সময়মতো ব্রেক কষতে পেরেছিল, নইলে ওই তিনজন জায়গায় পুডিং হয়ে যেত। এবার বলুন মহামান্য আদালত, দোষ কার! বেপরোয়া বাসের! নাকি অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে ঝুলতে থাকা কোমলমতিদের। একটু ভেবে দেখবেন। নিজে নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যকে না হয় নাই বা দুষলেন।

ঘটনা-২ 
রাস্তায় জবজবে জ্যাম, গাড়িতে ঠাসা, জেলির মতো চটচটে আঠালো হয়ে আছে একেবারে। মেলাদিন বাদে অনেক গাড়ি একসাথে নেমেছে, জ্যাম তো হবেই। এর মধ্য দিয়ে সমানে ছুটছে পদচারী মানুষ, যেন ঘোড়দৌড়। আমি গাড়িতে চেপে যাচ্ছি, স্বভাবতই বাইরে চোখ চলে যায়। এই শহরে নিত্যনতুন কত কত  নাটক অভিনীত হয়! চোখ তো দেখবেই।

দুই ছাত্র, সঙ্গে বোধ করি তার মা কিংবা খালা। রাস্তার ওপারে স্কুল, ধানমন্ডি বয়েজ। তাদের খুব তাড়া। দেরি করে গেলে হয়তো স্কুলের মূলফটক বন্ধ হয়ে যাবে। তাই রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে! সিগনাল গ্রিন, গাড়ির জন্য, পদচারীর জন্য নয়। সেই চলমান গাড়ির যে স্রোত, তাকে থোরাই কেয়ার করে ছাত্ররা ছুটছে তাদের মা-মাসি সঙ্গে করে। আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবি, এদের কি জানের মায়া নেই! এখানে জেবরাক্রসিং নেই না হয় বুঝলাম, কিন্তু কাছেই তো দু-দুটো ওভারপাস আছে। সেখানে না গিয়ে তারা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তার মাঝ বরাবর ছুটছে কেন! এরা আসলেই কোমলমতি, নিজের জীবনের মূল্যটুকুও বোঝে না। সত্যি মায়া হয়, হয় করুণাও। অঘটন ঘটলে কার যাবে? না হয় বাসের চালক আর মালিক দুজনেই কারাবরণ করলো, বিচারে তাদের সাজাও হলো, তাতে কি হারানো প্রাণ ফিরে পাওয়া যাবে!

অথচ চাইলেই এই অপঘাত এড়ানো যায়। একটু কষ্ট করে ওভারব্রিজ ব্যবহার করলেই হয়। এটাই নিয়ম। অথচ আমি নিজে আইন ভঙ্গ করে বাসচালকের সাজা দাবি করছি। এমন দ্বিচারিতা করে কি আদৌ শেষরক্ষা হবে! নিরাপদ সড়ক মিলবে!

ঘটনা-৩
আমরা জোরকদমে প্রযুক্তির পথে হাঁটছি। একেকজন একাধিক মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। নিজের সন্তানের চেয়ে এখন স্মার্টফোন বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। ছেলেকে ঠেলে ফেলে দিয়ে স্মার্টফোন বুকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকি। ডিজিটালাইজড বাংলাদেশে এটুকু অনিয়ম আমরা করতেই পারি। কিন্তু তাই বলে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পারাপার! পাগল নাকি!

অফিসে যাবার মুখেই যত অঘটন দেখতে পাই। দৃশ্যপট সেই আসাদ গেট ক্রসিং। জনৈক নাদান কানে ফোন চেপে ধরে রাস্তা পার হচ্ছেন। সমানে বকবক করছেন, অথচ খেয়াল নেই যে সিগনাল গ্রিন। মানে গাড়ির স্রোত চলতে শুরু করেছে। হতে পারে বাড়ি থেকে কোনো জরুরি খবর এসেছে। পদচারী তাই হিতাহিত ভুলে সমানে কথা বলে যাচ্ছেন মোবাইল ফোনে। কখনও হাসছেন, আবার কখনও রাগ দেখাচ্ছেন। তা তিনি করতেই পারেন, কিন্তু রাস্তা তো তার বাসার ড্রয়িং রুম বা বাড়ির আঙিনা নয় যে ইচ্ছেখুশি চলাচল করবেন!

সিভিক্স সেন্স বলে একটা কথা আছে। আপনি শুধু ফিটনেসবিহীন বাস আর বাসচালকের দোষ ধরবেন, কিন্তু নিজে কমন সেন্সের ধার দিয়েও যাবেন না, তারপর দুর্ঘটনা ঘটলে সব দোষ নন্দ দোষ- এ কেমন নীতি বলুন! মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পারাপারের এই অপচেষ্টা যতদিন না বন্ধ হবে, ততদিন কেউ নিরাপদ সড়কের গ্যারান্টি দিতে পারবে না।

ঘটনা-৪
লোকাল বাসের যাত্রী হয়ে যাচ্ছি, বাসের কন্ডিশন খারাপ বাসে উঠেই বুঝতে পারি। ভাবলাম নেমে যাই, কারণ যেকোনো কিছুর থেকেই জীবনের দাম বেশি। আমি দু-চারজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম, কিন্তু তারা নামবেন না, এই বাসে চেপেই গন্তব্যস্থলে যাবেন।

বাস একটু এগোয়, তারপর আবার থেমে যায়। ইঞ্জিন বেয়াড়া ধরনের গোঙানি করে। ধোঁয়াও বেরোয়। যেকোনো সময় আগুন লেগে যাবার সম্ভাবনা। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের কী করণীয় ছিল- তক্ষুণি নেমে যাওয়া এবং নেমে গিয়ে পুলিশকে খবর দেয়া। অথচ এটুকু কাজ কেউ করেনি, বরং কেউ খোশগল্পে, কেউ প্রেমালাপ, আবার কেউ স্মার্টফোন টেপাটিপিতে ব্যস্ত রইলেন। দুজন আবার সামনে ঝগড়া জুড়ে দিলেন বাসচালকের সাথে। বাস কেন গোঙায়! চালকের মাথাগরম, সে মুখ খারাপ করে বসলো। ব্যস, শুরু হয়ে গেল ‘কোমলমতি’ সুধিজনের তাকে সদাচরণ শেখানো। চালক দরদর করে ঘামছে, তার চোখ লাল, ক’রাত ঘুমোয়নি কে জানে! আফটার অল, সেও মানুষ! তারও জৈবিক  চাহিদা রয়েছে।

ফলে আমার চোখের সামনেই এক রিকশাকে সে যাত্রীসমেত প্রায় চাপা দিল। কারণ সুধিজনেরা তাকে সমানে উসকাচ্ছিল। বাসচালকের পড়াশুনো কম, তার ধৈর্যেরও বালাই নেই। না না, আমি তার পক্ষাবলম্বন করছি না, আমি শুধু কোমলমতি সুধিজনদের কথা বলছিলাম। আগে নিজে শোধরান, তারপর নিরাপদ সড়কের দাবি তুলবেন।

আপনি রিকশা চেপে যাচ্ছেন, তাকে বারবার তাড়া দিচ্ছেন, এই রিকশা, জোরে চালাও। সকাল থেকে কিছু খাওনি নাকি! পান্তা খাইছো! এই অবস্থা ক্যান! ব্যস, নাচুনি বুড়ি নাচার জন্য তৈরি, আপনিও বেশ ঢাকের বাড়ি দিয়ে বসলেন। সে উড়ালপঙ্খীর মতো রিকশা নিয়ে ছুটছে। বাস-গাড়ি কিছু পরোয়া করছে না। সিগনাল মানার আদত ওদের কখনোই ছিল না। রিকশায়ালারা মনে করে তার হক সবার আগে। সে যেমন খুশি রিকশা চালাবে, কারো কিচ্ছু বলার নেই। আমি মনে করি, ওদের বেআইনি চলাচলও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

এমন আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে যেখানে দেখা যায় বাস, চালক বা বাসের মালিক দায়ী নয়। অঘটনের জন্য দায়ি আমরা, অবিবেচক মানুষ। আমি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছি না, ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে নামবে না, তা আমিও চাই। কিন্তু আমাদের আচরণ বা সোজা বাংলায় যাকে বলে খাসলত না বদলালে সড়ক দুর্ঘটনা থামবে না, এ-কথা আমি হলপ করে বলতে পারি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




https://www.facebook.com/
Design & Developed BY ThemesBazar.Com