রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ১০:৫৩ অপরাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার বার্ষিকী আজ স্মৃতিতে বেঁচে আছে বাংলাদেশিরাও

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার বার্ষিকী আজ স্মৃতিতে বেঁচে আছে বাংলাদেশিরাও

শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল এইচ মিয়া—নিউ ইয়র্কে ন্যাশনাল ৯/১১ মেমোরিয়াল ও মিউজিয়ামের ‘নর্থ মেমোরিয়াল পুলের’ স্মৃতিফলকে পাশাপাশিই আছে নাম দুটি। তাঁরা দুজন কাজ করতেন টুইন টাওয়ারের মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনান কম্পানিতে। ২০০১ সালের আজকের এই দিনে ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলায় (৯/১১) নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনানের ২৯৫ জন কর্মী ও ৬৩ জন পরামর্শক নিহত হলেও ওই কম্পানি আলাদাভাবে মনে রেখেছে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী শাকিলা ও নূরুলকে।

তাঁদের সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করে মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনান লিখেছে, ‘শাকিলা ও নূরুলের প্রথম দেখা হয় সম্ভবত ১৯৯৫ সালে তাঁদের এক বন্ধুর বিয়েতে। বিয়ের আগে তাঁরা প্রায় পাঁচ বছর দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত সুখী এক দম্পতি। শাকিলা ছিলেন নূরুলের জন্য; আর নূরুল ছিলেন শাকিলার জন্য। তাঁরা পরস্পরকে খুব ভালোবাসতেন। আমরা যত দূর জানি, ১১ সেপ্টেম্বরের নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র দম্পতি শাকিলা ও নূরুল।’

তাঁরা দুজন থাকতেন নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে। নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিল ২০০৬ সালে শাকিলা ইয়াসমিন ও নূরুল এইচ মিয়ার নামে নিউ ইয়র্কে দুটি রাস্তার নামকরণ করে। ৯/১১ হামলায় নিহত বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি-আমেরিকানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া যায় শাকিলা (২৬) ও নূরুল (৩৬) সম্পর্কে। বিয়ের দেড় বছরের মধ্যে তাঁরা নিহত হন। শাকিলার অফিস ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ১ নম্বর টাওয়ারের ৯৭ তলায়। আর নূরুলের অফিস ছিল একই টাওয়ারের ৯৩ তলায়। সন্ত্রাসী হামলার অংশ হিসেবে প্রথম ফ্লাইটটি যখন তাঁদের ওই টাওয়ারে আঘাত হানে তখন নূরুল ৯৯ তলায় একটি বৈঠকে ছিলেন।

মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনান কম্পানি শাকিলার স্মরণে লিখেছে, ‘১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট বাংলাদেশে সংকটময় সময় ছিল। সেদিন বিকেলেই জন্ম হয় শাকিলার। শৈশবেই অত্যন্ত প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা শাকিলা স্কুলের অনেক অনুষ্ঠানে গান গাইতেন ও কবিতা আবৃত্তি করতেন।’

৯/১১ মেমোরিয়ালে শাকিলার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তাঁর ডায়েরির ছবি সংরক্ষিত আছে। ওই ডায়েরির বাঁ পাশের পৃষ্ঠায় নিজ হাতে লেখা রবীন্দ্রসংগীত—‘আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই তুমি তাই গো (২)’, ডান পাশের পৃষ্ঠায় মান্না দের আধুনিক গান—‘পৃথিবী আমারে চায় রেখো না বেঁধে আমায়’।

বাবা শরিফ এ চৌধুরী ও মা শওকত আরা শরিফের সঙ্গে শাকিলা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন ১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাসে। ২০১৩ সালে ৯/১১-এর দ্বাদশ বার্ষিকীতে ‘নর্থ মেমোরিয়াল পুলের’ শাকিলার নামের পাশে তাঁর মা শওকত আরা শরিফের কান্নার ছবি ধরা পড়ে রয়টার্সের ক্যামেরায়।

৯/১১ মেমোরিয়ালে শাকিলার জন্মস্থান ঢাকা এবং নূরুল এইচ মিয়ার জন্মস্থান বাংলাদেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মেমোরিয়ালে আরো চারজন নিহতের জন্মস্থান হিসেবে বাংলাদেশের নাম আছে। নিহত আবুল কে চৌধুরী (জন্ম ১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি) কাজ করতেন ক্যান্টর ফিেজরাল্ডে। স্বজনদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আবুল কে চৌধুরীর নামের পাশে তাঁরই আত্মীয় হিসেবে নিকোলাস ক্রেগ ল্যাসম্যানের (জন্মস্থান : নিউ ইয়র্ক) নাম রয়েছে।

১৯৬০ সালে কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ শাহজাহান কাজ করতেন মার্শ অ্যান্ড ম্যাকলিনানে। মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরীর (জন্ম সাল ১৯৬২) জন্মস্থান হিসেবে বাংলাদেশ লেখা হলেও সুনির্দিষ্টভাবে জেলা উল্লেখ নেই। টুইন টাওয়ারে হামলার দিন তিনি নর্থ টাওয়ারের ১০৬ ও ১০৭ তলায় ‘উইন্ডোজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডে’ কর্মরত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে সিলেটে জন্মগ্রহণকারী সাব্বির আহমেদও ছিলেন ‘উইন্ডোজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের’ কর্মী।

টুইন টাওয়ারে হামলায় নিহতদের স্মরণে সেখানে গ্রাউন্ড জিরোতে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ। ৯/১১-এর দশম বার্ষিকীতে সেই স্মৃতিসৌধটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। টুইন টাওয়ারের ভবন দুটির স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি পুল। সেখানে ৩০ ফুট গভীরে চারপাশ থেকে অবিরাম গড়িয়ে পড়ে পানি। পুল দুটির চারপাশের দেয়ালে তামায় খোদাই করা আছে নিহতদের নাম।

৯/১১-এর ওই সন্ত্রাসী হামলার পর ঘটনাস্থল ও এর আশপাশে ৫০ থেকে ৬০ জন বাংলাদেশি/ বাংলাদেশি-আমেরিকান নিখোঁজ ছিল বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ১২ জন নিহত হওয়ার তথ্য মেলে। সংবাদপত্র বিক্রেতা মোহাম্মদ সাদেক আলী (৬২) ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার সময় ঘটনাস্থলের খুব কাছে ছিলেন। তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি।

মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী সাধারণত সন্ধ্যার শিফটে কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর সন্তানসম্ভাবনা স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য তিনি সকালের শিফটে কাজ নিয়েছিলেন। আর সেদিনই ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলা ঘটে। ওই হামলার ৪৮ ঘণ্টা পর তাঁর সন্তান পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখে।

আমেরিকান প্রিমিয়ার কেবল ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন নেটওয়ার্ক হোম বক্স অফিস (এইচবিও) তাদের ৯/১১ নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রে সালাহউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের মর্মান্তিক কাহিনি তুলে ধরেছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ছিনতাই হওয়া দুটি যাত্রীবাহী বিমানের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায় পাশাপাশি থাকা দুটি সুউচ্চ ভবন, যা পরিচিত ছিল টুইন টাওয়ার নামে। শুধু তাই নয়, হামলা হয়েছিল প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনেও। এ ছাড়া ছিনতাই হওয়া আরো একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল পেনসিলভানিয়ার শাংকসভিলে। ভয়ংকর এ সন্ত্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের অহংকার; ঝরে গিয়েছিল প্রায় তিন হাজার প্রাণ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




Design & Developed BY ThemesBazar.Com