শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮, ১২:০১ পূর্বাহ্ন

কুরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

গড়েয়া ফাযিল মাদরাসা, ঠাকুরগাঁও:পবিত্র কুরআনে এসেছে- (ইব্রাহীম (আ.) যখন আমার কাছে দু‘আ করল) “হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর। সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম। অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বললঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিযে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ। সে বললঃ পিতাঃ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল। তখন আমি তাকে ডেকে বললামঃ হে ইব্রাহীম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু। আমি তার জন্যে এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিয়েছি যে, ইব্রাহীমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে ছিল আমার বিশ্বাসী বান্দাদের একজন।” [সূরা আস- সাফফাত: ১০০-১১১]

ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জানান যে, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইব্রাহীম (আ.) যখন তার পিতৃভুমি থেকে হিজরত করলেন, তখন তিনি তার প্রভুর কাছে চেয়েছিলেন যে, তিনি যেন তাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করেন। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এটা ছিল ইসমাঈলের (আ.) ব্যাপারে, কেননা তিনি ছিলেন ইব্রাহীমের (আ.) ঔরসে জন্ম নেয়া প্রথম সন্তান। এ ব্যাপারে বিভিন্ন দ্বীনের (ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলিম) অনুসারীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে ইব্রাহীমের ঘরে ইসমাঈলই প্রথম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/১৫৭-১৫৮)

‘অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল’- এর অর্থ হচ্ছে, যখন সে বড় হয়েছিল এবং তার বাবার মত নিজেই নিজের দেখাশোনা করতে পারত। ইবনু আববাস (রা.) বলেন, ঐ সময় তিনি কেবল সাবলকত্বে উপনীত হয়েছিলেন। (তাফসীরে কুরতুবী, ১৫/৯৯) এ রকম একটা অবস্থা যখন আসল, তখন ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন যে, তাঁকে তার ছেলেকে কুরবানী করার আদেশ দেয়া হচ্ছে।

নবীদের স্বপ্ন হচ্ছে ওহী। সুতরাং আল্লাহ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে, তার প্রিয়পুত্রকে কুরবানী করার আদেশ দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন- যে পুত্রকে তিনি তার বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েছিলেন এবং তারপর শিশু অবস্থায় তাকে এবং তার মাকে মরুভুমিতে রেখে আসার আদেশ পেয়েছিলেন, এমন একটা উপত্যকায় যেখানে কোন জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ ছিল না, কোন মানুষজন ছিল না, কোন বৃক্ষরাজি ছিল না এবং কোন পাখ-পাখালী বা পশুও ছিল না। ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর আদেশ পালন করলেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে তাদের সেখানে রেখে আসলেন। আর আল্লাহ তাদের জন্য অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিযিক পাঠালেন। এত কিছুর পরেও, তার ঘরে প্রথম জন্ম নেয়া ও তার একমাত্র পুত্রকে কুরবানী করার জন্য যখন আদেশ করা হলো, তিনি তখন তাঁর প্রভুর ডাকে সাড়া দিলেন এবং তার প্রভুর আদেশ মেনে, তিনি যা চেয়েছিলেন, তা করতে উদ্যত হলেন। তাই তিনি তার পুত্রকে বিষয়টি বললেন- যেন সে শান্ত থাকে এবং জোর করে তাকে কুরবানী করতে না হয়।

“হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি (আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য কুরবানী করছি)। অতএব, তোমার মতামত কি?” ধৈর্যশীল ছেলেটি সাথে সাথেই জবাব দিল, ‘সে বলল, “হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা-ই পালন করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।” সে সবচেয়ে উত্তম জবাব দিল, এটাই ছিল তার পিতার প্রতি এবং মানবকূলের প্রভুর প্রতি বাধ্যতার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল” – এ আয়াতের ব্যখ্যায় ইবনে আববাস (রা.) বলেছেন- “তারা দু‘জন যখন নিজেদেরকে আল্লাহর আদেশের কাছে সমর্পণ করলেন এবং ইবরাহীম (আ.) তার সন্তান ইসমাইল (আ.) এর মুখ মাটির দিকে করে রাখলেন। যেন তিনি যবেহ করার সময় তার মুখটা দেখতে না পান। ‘তারা উভয়ে নিজেদের সমর্পণ করল’ এর অর্থ হচ্ছে ইব্রাহীম (আ.) বললেন, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’ আর ছেলেটি বলল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ – কেননা সে মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছিল।” আস সুদ্দী এবং অন্যান্যরা বলেন যে, ইব্রাহীম (আ.) ছেলের গলদেশে ছুরি চালান, কিন্তু তা তাকে কাটেনি। এটা বলা হয়ে থাকে যে, ছুরি ও তার গলার মাঝখানে একটা তামার পাত রাখা হয়েছিল (এবং আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।) তারপর তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল যখন আল্লাহ বললেন,

“হে ইব্রাহীম! তুমি তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছ!”- (সূরা সাফফাত-১০৫)

এর অর্থ হচ্ছে উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে, তোমাকে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তোমার প্রভু তোমাকে যে আদেশ করেছেন, তা পালন করার ব্যাপারে তোমার ইচ্ছা ও আনুগত্য প্রমাণিত হয়েছে। তোমার পুত্রের পরিবর্তে বিকল্প কুরবানীর ব্যবস্থা করা হবে- যেমন ভাবে তুমি তোমার নিজের শরীরকে আগুনের শিখায় সমর্পণ করেছিলে এবং তোমার অতিথিদের সম্মান জানাতে তোমার সম্পদ খরচ করেছিলে, তা স্মরণ রেখে। তাই আল্লাহ বলেন,

‘নিশ্চয় এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা’- (সূরা সাফফাত-১০৬)

অর্থাৎ এটা যে একটা পরীক্ষা ছিল তা পুরোপুরি স্পষ্ট। নিঃসন্দেহে এখানে মূল উদ্দেশ্য যবেহ ছিল না, বরং উদ্দেশ্য ছিল পিতা-পুত্রের আনুগত্য ও তাক্বওয়ার পরীক্ষা নেওয়া। সে পরীক্ষায় উভয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন পিতার পূর্ণ প্রস্ত্ততি এবং পুত্রের স্বতঃস্ফুর্ত সম্মতি ও আনুগত্যের মাধ্যমে।

“আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্ত।” (সূরা সাফফাত-১০৭)

এর অর্থ হচ্ছে ‘আমি তার ছেলের মুক্তিপণের ব্যবস্থা করলাম, তার পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে যবেহ করার জন্য।’ অধিকাংশ আলেমের মতে, এটা ছিল শিং বিশিষ্ট খুব সুন্দর, শুভ্র ও উৎকৃষ্ট একটি ভেড়া। ইবনে আববাস (রা.) বলেন- ‘এটা ছিল এমন একটা ভেড়া যা চল্লিশ বছর ধরে জান্নাতে ঘুরে বেড়িয়েছে।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/১৫৭-১৫৮)

মুলত পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) এর সময়কাল থেকেই কুরবানির ধারা শুরু হয় এবং তা বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্রত্যেক নবীর নবুওয়াতকালেই চলমান ছিল। তবে উম্মতে মুসলিমার এই কুরবানি ও এর পালনপদ্ধতি হযরত ইবরাহীম (আ.) এর কুরবানি থেকেই এসেছে। বস্তুত হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর পুত্রকে কুরবানি দেয়ার এ অনন্য ঘটনাকে অবস্মিরণীয় করে রাখতে আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য কুরবানিকে ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ বলেন- فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ অর্থাৎ অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কোরবানি করুন। (সূরা কাউসার : আয়াত ২)।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




https://www.facebook.com/
Design & Developed BY ThemesBazar.Com