রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন

ইতিহাসের বৃহত্তম বাণিজ্যযুদ্ধের পদধ্বনি

ইতিহাসের বৃহত্তম বাণিজ্যযুদ্ধের পদধ্বনি

ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া শুল্কারোপের পদক্ষেপের ফলে বিশ্ববাণিজ্য পরিস্থিতি নূতন মোড় নিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ গত শুক্রবার হইতে কার্যকর হইয়াছে। তিন হাজার ৪শ’ কোটি ডলারের চীনা পণ্যের উপর এই শুল্ক কার্যকর হইয়াছে। ইহার জবাবে ৫৪৫টি মার্কিন পণ্যের ওপর সমহারে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করিয়াছে চীন। চীনা পণ্যে শুল্কারোপের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই বাণিজ্যযুদ্ধ শুধু দুটি দেশেই সীমিত থাকিতেছে না; বরঞ্চ গোটা বিশ্বকে নূতন এক যুদ্ধের দিকে ধাবিত করিয়াছে। চীনও বলিয়াছে, ইহা ইতিহাসের বৃহত্তম বাণিজ্যযুদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছোড়া প্রথম গুলিটি চীনের উপর দিয়া গেলেও ইউরোপের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ বাধিয়া গিয়াছে। রাশিয়াও আর পিছাইয়া থাকিবে কেন? শুল্কারোপ ও পাল্টা পদক্ষেপের এই ফলাফল স্থিতিশীল বাণিজ্য ব্যবস্থাকেই শুধু নষ্ট করিবে না, বরং বিশ্ববাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাবও পড়িবে। মরগান স্ট্যানলি এক গবেষণায় বলিয়াছেন, মার্কিন শুল্কের ফলে এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যের শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ১ শতাংশের মতো প্রভাব পড়িবে। সেই প্রভাবের শিকার হইবে গোটা বিশ্ব। বাণিজ্যের সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকিবার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি ইতোমধ্যে পূর্বাভাস দিয়াছে যে, বিশ্ব প্রবৃদ্ধির হারও এই বত্সর কমিয়া যাইবে। তাহার মানে কর্মসংস্থানও কমিয়া যাইবে।
প্রকারান্তরে বিশ্ব নূতন করিয়া আরেকটি মন্দার দিকেই ধাবিত হইতেছে—এমনটিও আশঙ্কা করা হইতেছে। অথচ ট্রাম্প ক্ষমতায় আসিবার পর হইতে আমেরিকায় কর্মসংস্থান বাড়িতেছে। নির্বাচনী ওয়াদামতো তাহার দেশে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হইতেছে এবং যেই সকল কলকারখানা অন্য দেশে স্থানান্তর হইয়া গিয়াছে, সেইগুলি ফিরাইয়া আনিবার জন্য তথা দেশে কলকারখানা বাড়াইবার উদ্যোগ লইবার কথা জানা যাইতেছে। তাহার এই বাণিজ্যযুদ্ধ কিছুটা সেই ওয়াদা বাস্তবায়নের আলামত হইতে পারে। কিন্তু আজকের বিশ্বে কাহারো পক্ষে আর এককভাবে চলিবার অবস্থা নাই। খোদ আমেরিকায় চীনা বিনিয়োগ কিংবা চীনে আমেরিকান বিনিয়োগের হিসাব দেখিলে ইহা স্পষ্ট যে, এই যুদ্ধে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। বরং ইহার ঝাঁকুনি বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করিয়া তুলিবে। তাহা হইলে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও ট্রাম্প কেন এইরূপ যুদ্ধে জড়াইলেন, সেই প্রশ্নে কোনো কোনো মহলের ইঙ্গিত—ইহার মধ্যে ট্রাম্প কোনো রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করিতেছেন কি না? এমনকি মিত্র দেশগুলির সঙ্গেও তাহার একই আচরণ সংশয়ের উদ্রেক করিয়াছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই বাণিজ্যযুদ্ধ চলিতে থাকিলে এবং বিশ্ব আরেকটি মন্দার দিকে ধাবিত হইলে উন্নতির দিকে ধাবিত হওয়া বাংলাদেশের মতো দেশগুলির অবস্থা কী হইবে? গত এক দশকে বাংলাদেশের যে অসাধারণ অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে, তাহাতে এই যুদ্ধ কোনো ব্যাঘাত ঘটাইবে কি না? প্রশ্নটি যৌক্তিক এবং ইহার উত্তরে বলা যায়, বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্যিক অঙ্গন হইতে বিচ্ছিন্ন নহে। বরং বিশ্ববাণিজ্যে দেশটির হিস্যা ক্রমেই বাড়িতেছে। যাহার উপর নির্ভর করিয়া শুধু তৈরি পোশাক খাতেই ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যে আগাইয়া যাইতেছে দেশটি। অন্যান্য পণ্যেরও চাহিদা এবং নূতন বাজার সৃষ্টি সন্তোষজনক। এই অবস্থায় রফতানি বাজারের গতি বিঘ্নিত হইবার শঙ্কা রহিয়াছে। যেহেতু চীন কোনো কোনো পণ্যখাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী, দেশটি তখন বিকল্প বাজারের দিকে ধাবিত হইবে। তাহাতে মূল্য ও মান প্রতিযোগিতা তীব্র হইবে। বাড়িয়া যাইবে ব্যবসার খরচও। চীন হাই-এন্ড পণ্যের বদলে লো—এন্ডের পণ্যে মনোযোগ দিবে। এইধরনের পণ্যের অন্যতম গার্মেন্ট শিল্প। চীন যদি এই শিল্পে বিশেষ মনোযোগী হয়, তাহা হইলে বাংলাদেশও চাপে পড়িবে। সম্ভাব্য এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াইতে বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিয়া রাখিতে হইবে। বিকল্প বাজার এবং বড় বাজার ধরিয়া রাখিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার করিতে হইবে। সর্বোপরি, এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হয় কি না, তাহা গভীর পর্যবেক্ষণে রাখিতে হইবে। সরকারের পাশাপাশি পণ্য উত্পাদকদেরও এই বিষয়ে গভীর মনোযোগ জরুরি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




https://www.facebook.com/
Design & Developed BY ThemesBazar.Com