রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০২:২১ পূর্বাহ্ন

কোচিং বাণিজ্য ও বদলির সুপারিশ প্রসঙ্গে

কোচিং বাণিজ্য ও বদলির সুপারিশ প্রসঙ্গে

কোচিং বাণিজ্য ও বদলির সুপারিশ প্রসঙ্গে
দীর্ঘদিন ধরিয়া একই কর্মস্থলে থাকা শিক্ষকদের মধ্যে কোচিং বাণিজ্যে জড়াইয়া পড়িবার প্রবণতা রহিয়াছে—এমন সকল শিক্ষকের বদলির কার্যক্রম চলিতেছে। এই কথা গত শনিবার সংসদকে জানাইয়াছেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। তাহার মতে, বিভিন্ন পর্যায়ে গঠিত মনিটরিং কমিটির তত্পরতায় কোচিং বাণিজ্য বন্ধে অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে।
বেশ ভালো কথা। কিন্তু প্রশ্ন হইল, কোচিং বাণিজ্য যদি অপরাধ হইয়া থাকে তবে ইহার যথোপযুক্ত শাস্তি কি কেবল ‘বদলি’? বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করিবার জন্য আমাদের বুঝিয়া নেওয়া দরকার ‘কোচিং’ কী এবং কেন অপরাধ? একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের চৌহদ্দির মধ্যে বিষয়ানুযায়ী যতটুকু সম্যকভাবে অনুধাবন করিতে পারেন, তাহা বিবিধ কারণে ওই শিক্ষার্থী বা তাহার অভিভাবকের নিকট ‘যথেষ্ট’ মনে হইতে নাও পারে। এইক্ষেত্রে ওই শিক্ষার্থীর অভিভাবক আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী তাহার সন্তানের বিদ্যাশিক্ষা আরো নিপুণ ও সহজ করিতে গৃহশিক্ষকের বন্দোবস্ত করিতেই পারেন। অতঃপর সাশ্রয়ী হইবার কারণে একাধিক শিক্ষার্থী একত্রে কোনো গৃহশিক্ষকের নিকট পঠনপাঠন করিলে তাহার একটি ‘কোচিং’ রূপ তৈরি হয়। স্পষ্টতই আদিরূপে কোচিং কোনো অন্যায় কিছু নহে, পৃথিবীর সকল দেশেই ইহা নানারূপে দেখা যায়। কিন্তু এই কোচিং বাণিজ্যই যখন কোনো শিক্ষকের অন্যতম প্রধান অর্থ উপার্জনের পেশা হিসাবে আবির্ভূত হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই ওই শিক্ষকের নিকট তাহার নিজ স্কুলে শিক্ষাদানের প্রধান কাজটি গৌণ হইয়া যাইতেও পারে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা কোচিং বাণিজ্যের সহিত যুক্ত শিক্ষকদের নিকট জিম্মি হইয়া পড়িয়াছেন যাহা পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করিতেছে এবং এই ব্যয়নির্বাহে হিমশিম খাইতেছেন অভিভাবকগণ। এমতাবস্থায় মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে দায়েরকৃত রিট পিটিশনের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করিয়া ২০১২ সালে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়, যাহা ওই বত্সর ২০ জুন প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কোচিং বাস্তবতাকে মাথায় রাখিয়াই নীতিমালায় বলা হয়, শিক্ষকরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের অনুমতি গ্রহণ সাপেক্ষে অন্য স্কুল, কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় পড়াইতে পারিবেন। তবে কোনো কোচিং সেন্টারের নামে বাসা ভাড়া লইয়া কোচিং-বাণিজ্য পরিচালনা করিতে পারিবেন না।
কিন্তু কোচিং-বাণিজ্য বন্ধে শাস্তির বিধানসহ নীতিমালা প্রণয়নের পরও কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ হয় নাই। এমতাবস্থায় গত বত্সর পহেলা নভেম্বর কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত ৫২২ শিক্ষকের বদলির সুপারিশ করে দুদক। ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ অমান্য করিলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জড়িত শিক্ষকের বেতনের সরকারি অংশ (এমপিও) বাতিল বা স্থগিত এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও পাঠদানের অনুমতি বাতিলের কথা বলা হইয়াছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকিলে ‘সরকারি কর্মচারী বিধিমালা, ১৯৮৫’ অনুযায়ী তাহা পেশাগত অসদাচরণ হিসাবে গণ্য করিয়া উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা আপিল বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হইয়াছে। প্রশ্ন হইল, সরকারি ও বেসরকারি উভয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই নীতিমালা অমান্যের যেই শাস্তির কথা বলা হইয়াছে, তাহা কি শুধুই বদলির সুপারিশ? আমরা বরাবরই বলিয়া আসিতেছি, নিয়মকানুন ও আইনশৃঙ্খলা মানিবার বিকল্প নাই। ফাঁকফোকর খুঁজিয়া নিয়মকানুনকে পাশ কাটাইলে তাহা বিশৃঙ্খলাকে আরো উসকাইয়া দেয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




https://www.facebook.com/
Design & Developed BY ThemesBazar.Com